Home সাদা কালো কিংবদন্তী জাভেদ’র সঙ্গে এক সন্ধ্যায়
কিংবদন্তী জাভেদ’র সঙ্গে এক সন্ধ্যায়

কিংবদন্তী জাভেদ’র সঙ্গে এক সন্ধ্যায়

0
0

দর্শকের চোখে তিনি এখনো নায়ক। তিনি জাভেদ। তবে একজন নৃত্য পরিচালক হিসেবেও তিনি সফল। দেশীয় চলচ্চিত্রের এক সময়ের পর্দা কাঁপানো এই নায়ক এখন কেমন আছেন, কী করছেন তাই জানার চেষ্টা করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে। লিখেছেন আলী আহমেদ
জাভেদ অন্য নায়কদের চেয়ে একটু নয় অনেকখানিই আলাদা। যেখানে অন্য নায়কেরা শুধু নিজের চরিত্রে অভিনয় করেই চলচ্চিত্রে নিজেদের অবদান রেখেছেন, সেখানে জাভেদ নিজের চরিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি ানেক চলচ্চিত্রে নৃত্য পরিচালক হিসেবে কাজ করে আলাদা একটি ভূমিকা রেখেছেন। তাই এদেশের নায়কদের কাতারে তাঁর নাম যেমন সম্মান আর শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয় ঠিক তেমনি এদেশের চলচ্চিত্রের নৃত্য নির্দেশনার ক্ষেত্রে জাভেদ’র অবদান শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়। আর এ কারণেই জাভেদ বাংলাদেশের অন্য নায়কের চেয়ে অনেক আলাদা। অভিনয় দিয়ে তিনি এদেশের সিনেমাপ্রেমী দর্শককে মুগ্ধ করেছেন। যদিও এখন তিনি অভিনয় করছেন না কিন্তু জাভেদ বলেন,‘ ভালো গল্প এবং চরিত্র পেলে অবশ্যই অভিনয় করবো, কেন নয়!’ জাভেদের ইচ্ছে আছে আবার চলচ্চিত্রের নৃত্য নির্দেশক হিসেবে কাজ করার। কিন্তু তেমন কাজ ব্যাটে বলে মিলছেনা বিধায় জাভেদ’র কাজ করা হয়ে উঠছেনা। একজন নায়ক যখন নাচে বিশেষভাবে পারদর্শী থাকেন তখন অভিনয়ের পাশাপাশি গানগুলোতে তার পারফর্ম্যান্স হয়ে উঠে অনন্য অসাধারণ। জাভেদ অভিনীত চলচ্চিত্রগুলোতে এমন ক্ষেত্রে তার মেধার স্বাক্ষর রেখেছিলেন বিধায় তার অভিনীত চলচ্চিত্রগুলো দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে। এখনো স্টেজ শো’তে পারফর্ম করেন কিংবদন্তী এই নায়ক, নৃত্য পরিচালক। জাভেদ বলেন,‘ ভালো স্টেজ শোর প্রস্তাব এলে আমি পারফর্ম্যান্স করার চেষ্টা করি।’ অনেক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি, কাজ করেছেন নৃত্য পরিচালক হিসেবেও। প্রযোজক হিসেবে একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনাও করেছেন তিনি। নাম ‘বাহরাম বাদশা’। গেলো ১ জানুয়ারি রাজধানীর ঢাকা ক্লাবে একটি অনুষ্ঠানে দেখা হলে জাভেদ তার চলচ্চিত্র জীবনের অনেক কথাই শেয়ার করেন ইত্তেফাক’র সাথে। চলচ্চিত্রে কাজ করা প্রসঙ্গে জাভেদ বলেন,‘ চলচ্চিত্রে অভিনয় কওে, নৃত্য পরিচালক হিসেবে কাজ করেই আমি তৃপ্ত।

দর্শক আমাকে ভালোবেসেছেন, এটাই আমার অনেক বড় পাওয়া। তাদের ভালোবাসা নিয়েই বাকীটা জীবন কাটিয়ে দিতে চাই। সবার কাছে দোয়া চাই যেন ভালো থাকি, সুস্থ থাকি। চিত্রনায়ক জাভেদ ১৯৭০ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত নায়কদের মধ্যে ছিলেন ভীষণ জনপ্রিয়। নিজে নাচতেন ও নায়িকাদের নাচিয়ে পর্দা কাঁপিয়ে তুলতেন। শাবানা, ববিতা, অঞ্জু ঘোষ, রোজিনা, সুজাতা, সুচরিতা ছিলেন পর্দায় তার নায়িকা। পর্দায় নায়ক জাভেদের উপস্থিতি ছিলো দর্শকের কাছে অন্যরকম এক উত্তেজনা। দিলীপ কুমার, রঞ্জন, প্রেমনাথ ছিলেন তার আইডল হিরো, যে জন্য তাদের মতো করেই রূপালি পর্দায় অভিনয়ের চেষ্টা করে গেছেন তিনি। ‘নিশান’ ছবিতে জাভেদের অভিনয় প্রমাণ করেছিল, তিনিও যে রঞ্জনের মতো এক দুর্দান্ত, দুঃসাহসিক নায়ক। নায়ক হিসেবেই নয়, নৃত্য পরিচালক হিসেবেও এক সময় ছিল তার ব্যস্ততা। যে জন্য নিকটতম কাউকে সময় দিতে পারতেন না। দিনে-রাতে সমানে ছিল শুটিং। ঘুমানোর সময়ই ছিল না তার। গাড়ি ড্রাইভিং নিজেই করতেন, যে জন্য গাড়িতে বসে যে একটু ঘুমাবেন সে সময়টুকুও ছিল না ব্যস্ত নায়ক জাভেদের।  জাভেদের আসল নাম ইলিয়াস জাভেদ। জন্ম ১৯৪৪ সালে। জাভেদের বাবা রাজা মোহাম্মদ আফজাল ছিলেন ধর্মপরায়ণ। তিনি চাইতেন ছেলে ব্যবসায়ী হবে, নয়তো চাকরি করবে। কিন্তু জাভেদের ওইসব দিকে আদৌ মন ছিল না। কীভাবে অভিনেতা হওয়া যাবে এ নিয়েই তিনি ভাবতেন। সিনেমা দেখা, গান শোনাতেই মগ্ন ছিলেন জাভেদ। জাভেদের প্রথম অভিনীত চলচ্চিত্র ছিলো উর্দু ‘নয়ী জিন্দেগি’। কিন্তু এটি মুক্তি পায়নি। উর্দু চলচ্চিত্র ‘পায়েল’ (১৯৬৬) অভিনয়ের পর থেকেই জাভেদের নাম ধাম ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। নাচে-গানে মাতোয়ারা হয়ে জাভেদ অসাধারণ অভিনয় দেখিয়ে ছিলেন। ছবিতে জাভেদের সঙ্গে শাবানা ছিলেন। প্রথমদিকে জাভেদ নৃত্য পরিচালক হিসেবে নিজের সুনমা ছড়ান। ১৯৭৪ সালের পর থেকে জাভেদ ঢাকার ফিল্মে আবার ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। একে একে নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন মালকা বানু, অনেক দিন আগে, শাহাজাদা, রাজকুমারী চন্দ্রবান, সুলতানা ডাকু, আজো ভুলিনি, কাজল রেখা, সাহেব বিবি গোলাম, নিশান, বিজয়িনী সোনাভান, রূপের রানী, চোরের রাজা, তাজ ও তলোয়ার, নরমগরম, তিন বাহাদুর, জালিম, চন্দন দীপের রাজকন্যা, রাজিয়া সুলতানা, সতী কমলা, বাহারাম বাদশা, আলাদিন আলী বাবা, সিন্দাবাদ প্রভৃতি ছবিতে। অভিনয়ের পাশাপাশি এসব ছবিতে নৃত্য পরিচালক হিসেবেও তিনি কাজ করেছিলেন। জাভেদ এ পর্যন্ত প্রায় দুই শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। ‘নিশান’ ছবিটি তার জীবনে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ ছিল। ™ৈ^ত চরিত্রে জাভেদ অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন। তার নায়িকা ছিল ববিতা। ‘নিশান’ ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পরে দেশব্যাপী হৈ চৈ পড়েছিল জাভেদকে নিয়ে। পরবর্তীতে নায়ক হিসেবে প্রায় সব চলচ্চিত্রই ছিলো ব্যবসা সফল। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বিকাশে জাভেদ’র অবদান অপরিসীম। তাই এমন গুনী একজন শিল্পী’র অবদানকে রাষ্ট্র যথাযথ সম্মান দিবে এমনটাই আশা করেন জাভেদ ভক্তরা। তবে জাভেদ মনে করেন দর্শকের ভালোবাসাই তার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন।
ছবি : মোহসীন আহমেদ কাওছার