Home নাটকের আংগিনা বাবু’র সঙ্গে এক বিকেলে
বাবু’র সঙ্গে এক বিকেলে

বাবু’র সঙ্গে এক বিকেলে

0
0

নাটকে এবং চলচ্চিত্রে বহুমাত্রিক চরিত্রে অভিনয় করে নিজেই নিজেকে পরিণত করেছেন অভিনয়ের পাঠশালা হিসেবে। তিনি যে চরিত্রে অভিনয় করেন দর্শকের কাছে তা যেন বাস্তবের চরিত্র হয়েই ফুটে উঠে। তিনি শক্তিমান অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবু। তারসঙ্গে সম্প্রতি দেখা হওয়া এক বিকেলের গল্প থেকে পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো। তাকে নিয়ে লিখেছেন অভি মঈনুদ্দীন
বাংলাদেশের অভিনয়ের আঙ্গিনায় ফজলুর রহমান বাবু এমন একটি নাম যাকে ঘিরে এদেশের নাট্যকার কিংবা চলচ্চিত্রের কাহিনীকার চ্যালেঞ্জিং এবং অফট্র্যাক চরিত্রের ভাবনায় তাকেই রাখেন। টিভি নাটকে, মঞ্চ নাটকে এবং চলচ্চিত্রে বাবু বহুমাত্রিক চরিত্রের এক অনবদ্য নাম। দিনে দিনে তিনি নিজের অভিনীত চরিত্রগুলোতে নিজেকে পূর্ণাঙ্গরূপে পরিণত করে দর্শকের কাছে তিনি নিজেই হয়ে উঠেছেন অভিনয়ের পাঠশালা। আর তাই যেখানে অন্য অনেক শিল্পীকেই কাজের পেছনে ছুটতে হয় সেখানে বাবুর পেছনে কাজ ছুটে বেড়ায়। ফরিদপুর শহরের পশ্চিম আলীপুরে জন্ম নেয়া বাবুর বাবা মোকলেসুর রহমান ও মা নূরজাহান বেগম। তার পড়াশুনা শুরু খুলনার ভিক্টোরিয়া ইনফ্যান্ট স্কুলে। পরবর্তীতে ফরিদপুর হাইস্কুল, ফরিদপুর ইয়াসিন কলেজে পড়াশুনা করেন। বাবুর খুব মনেপড়ে ফরিদপুরের অশ্বিনী স্যার, মাওলানা ইউসুফ স্যার, তারাপদ স্যারের কথা। খুউব মনে পড়ে বন্ধু ফরহাদ, ফারুক, রুকু, মজু, বজলু, শফি ও শাহীনের কথা। স্যারদের শাসন ভালোবাসা আর বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে গল্পে, আড্ডায়, খেলাধুলায় গড়ে উঠে বাবুর জীবন। ফরিদপুর টাউন থিয়েটারের হয়ে প্রথম বাবু মঞ্চ নাটক ‘তালেব মাস্টারের হালখাতা’য় অভিনয় করেন মহিউদ্দিন আহমেদ’র নির্দেশনায়। পরবর্তীতে বৈশাখী নাট্যগোষ্ঠীর হয়ে ‘বিদ্রোহী পদ্মা’, ‘এবং তারপর’,‘জননীর মৃত্যু নাই’,‘লাশ ৭৪’ নাটকে অভিনয় করেন। ১৯৮৩ সালে ‘আরন্যক নাট্যদল’র হয়ে অভিনয় শুরু করেন বাবু। এই দলের হয়ে তার অভিনীত প্রথম নাটক ছিলো আরন্যক নির্দেশনা দলের ‘সাত পুরুষের ঋন’। এরপর তিনি ‘গিনিপিক’,‘কোরিওলেনাস’,‘ইবলিস’,‘ওরা কদম আলী’,‘পাথর’,‘খেলা খেলা’,‘জয় জয়ন্তী’,‘ময়ূর সিংহাসন’ নাটকে অভিনয় করেন। মঞ্চে তার আলোচিত চরিত্রে ‘জয় জয়ন্তী’র নবদ্বীপ ও ‘ময়ূর সিংহাসন’র অমূল্য। আবু জাফর সিদ্দিকী প্রযোজিত ধারাবাহিক নাটক ‘মৃত্যুক্ষুধা’ ছিলো তার অভিনীত প্রথম নাটক। মামুুনুর রশীদ রচিত ফখরুল আরেফিন প্রযোজিত ‘আদিম’ ছিলো তার প্রথম খ- নাটক। পথনাটক ‘ঘুমের মানুষ’এ তিনি গায়েন চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। আবার নবদ্বীপ চরিত্রটি ছিলো একজন কীর্তনিয়ার চরিত্র। যে কারণে গান তার বেশ দখলে ছিলো। বাবু প্রথম প্লে-ব্যাক করেন গিয়াস উদ্দিন সেলিমের ‘মনপুরা’ চলচ্চিত্রে ‘সোনাই হায় হায়’ ও ‘নিথুয়া পাথারে’ গানটি দুটির।

 

তার অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র প্রয়াত আব্দুল্লাহ আল মামুন পরিচালিত ‘বিহঙ্গ’। এরপর তিনি আবু সাইয়ীদের ‘শঙ্খনাদ’, গোলাম রব্বানী বিপ্লবের ‘স্বপ্ন ডানায়’,‘বৃত্তের বাইরে’, তৌকীর আহমেদ’র ‘দারুচিনি দ্বীপ’,‘অজ্ঞাতনামা’, ‘হালদা’, নাদের চৌধুরীর ‘মেয়েটি এখন কোথায় যাবে’, গিয়াস উদ্দিন সেলিমের ‘মনপুরা’,‘স্বপ্নজাল’, রায়হান রাফির ‘পোড়ামন টু’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। নির্মাণে কখনোই বাবুর আগ্রহ জন্মায়নি। আশির দশকের শুরুর দিকে অগ্রনী ব্যাংকে ক্যাশ অফিসার হিসেবে চাকরী শুরু করে বহু বছর ব্যাংকে চাকরীর করার পর ২০০৬ সালে অভিনয়ের জন্য নিজের ইচ্ছেতে চাকরী ছেড়ে দিলেন। ১৯৯২ সালে কাজী রোকসানা রমাকে বিয়ে করেন। বাবুর দুই মেয়ে অবন্তী ও প্রিয়ন্তী। ‘শঙ্খনাদ’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে বাবু প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি মেয়েটি এখন কোথায় যাবে’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে একই সম্মাননা লাভ করেন। দীর্ঘ অভিনয় জীবনের প্রাপ্তি প্রসঙ্গে বাবু বলেন,‘ অভিনয় জীবন থেকে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মানুষের ভালোবাসা। যখন কেউ আমার অভিনয় নিয়ে কথা বলেন তখন তারা বলেন যে আমি যে চরিত্রে অভিনয় করি তারা নাকী তা বাস্তব হিসেবেই ধরে নেন। এই যে মানুষের কাছে অভিনয় দিয়ে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা, এটা অনেক কঠিন কাজ। কঠিন কাজটি করার পর যখন দর্শকের ভালোবাসা পাই সেটাই অনেক বড় পাওয়া। দর্শক আমাকে নিজের মানুষ মনে করেন, এটাও আমার জন্য শান্তির।’ ১৯৮৪ সালের কথা, সে বছর জার্মান কালচার সেন্টারে অভিনয় করে প্রথম দুইশত টাকা পেয়েছিলেন বাবু। সেই টাকা দিয়ে মাকে শাড়িও কিনে দিয়েছিলেন তিনি। আর তখন থেকেই তার ভাবনায় ছিলো অভিনয় করে যদি টাকা আয় করা যায় তাহলে আর অন্যকিছু করবেন না তিনি। হলোও ঠিক তাই। বাবুর প্রিয় অভিনেতা এস এম সোলায়মান, মামুনুর রশীদ, আলী যাকের, আসাদুজ্জামান নূর, ফেরদৌসী মজমুদার ও নাজমা আনোয়ার।
ছবি- মোহসীন আহমেদ কাওছার